প্রবন্ধ : বাংলা ভাষায় বুদ্ধচর্চা


কলমে – ড. বারিদবরণ ঘোষ
_________________________________
বাংলা ভাষায় বুদ্ধচর্চায় ইতিহাস খুব একটা আধুনিক কালের না হলেও উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের আগে বুদ্ধালোচনা এই ভাষায় ততখানি গুরুত্ব পায়নি। উনিশ শতকে বাঙালির মনোজগতে যে সার্বিক জাগরণ ঘটে- তারই ফলে ধর্ম সমাজ সংস্কৃতি সমস্ত বিষয়েই তার আগ্রহ জেগে ওঠে। অস্বীকার করার উপায় নেই, এই জাগরণ ঘটেছিলো পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে বাঙালির ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সূত্রেই।

অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই বঙ্গদেশ বুদ্ধদেব বিষয়ে নানাভাবে আগ্রহ প্রকাশ করে এসেছে। পালরাজারা ছিলেন বৌদ্ধ এবং স্বভাবতই বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক। এই যুগেই প্রতিষ্ঠিত হয ওদন্তপুরী, সোমপুর, বিক্রমশীল মহাবিহারগুলি। পরবর্তীকালে বিপুল সংখ্যায় আবিস্কৃত বুদ্ধমূর্তি এই কালেরই দান। অসংখ্য বিহার ও অজস্র বৌদ্ধ পণ্ডিতাচার্য এই যুগেরই সম্পদ। তাঁদের মতো চন্দ্রবংশও ছিলো বুদ্ধানুরাগী। হরিকেল ছিলো বৌদ্ধতান্ত্রিক পীঠসমূহের অন্যতম। কম্বোজ রাজবংশ ভিন্ন প্রদেশ থেকে এলেও ছিলো বৌদ্ধধর্মানুগত।

গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগে বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রসার তেমন না ঘটলেও বেড়েছিলো তার প্রতিপত্তি। চতুর্থ শতকের সূচনাতেই আমরা দেখেছি চীনা বৌদ্ধ শ্রমণেরা বঙ্গদেশে যাতায়াত শুরু করেছেন। ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাঙের বিবরণী থেকে আমরা বঙ্গদেশে ক্রমপ্রসারমান এই ধর্মকে যেমন জেনেছি তেমনি জেনেছি এর বিপক্ষতার ইতিহাসকেও। হিউয়েন সাঙ তাম্রলিপ্তি নগরীতে দেখেছিলেন বাইশটি বৌদ্ধ বিহার। সপ্তম শতকে একজন বাঙালি বৌদ্ধ আচার্য হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন- তিনি শীলভদ্র নামেই সুপরিচিত।

পালযুগের পরবর্তী সময়ে কয়েকজন বাঙালি নৃপতি বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও গৌরবের চূড়ান্ত অবস্থার অবনমন ঘটতে থাকে।তা সত্বেও জয়দেব গোস্বামী ‘গীত গোবিন্দম্” এ বুদ্ধকে দশম অবতারের অন্যতম অবতার বলে উল্লেখ করেছেন। বন্দ্যঘটীয় সর্বানন্দের অমর কোষের টীকা, শূন্যপুরাণ, ধর্মমঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল প্রভৃতি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয কাব্যাদিতে বুদ্ধের নানান উল্লেখ আমরা পেয়েছি। কিন্তু ধীরে ধীরে বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব এরপর মন্দীভূত হতে আরম্ভ করে। প্রমথ চৌধুরী ভাষা- “অর্ধশতাব্দী পূর্বে বুদ্ধকে, তাঁর ধর্ম কি, বৌদ্ধ সঙ্ঘই বা কি, এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের মধ্যে কোটিতে একজনও দিতে পারতেন না; কারণ বৌদ্ধধর্মের এই ত্রিরত্নের স্মৃতি পর্যন্ত এদেশে বিলুপ্ত হতে গিয়েছিল। ‘বৌদ্ধ’ এই শব্দটি অবশ্য আমাদের ভাষায় ছিল, এবং বৌদ্ধ অর্থে আমরা শুনতুম- একটি পাষণ্ড ধর্মমত; কিন্তু উক্ত পাষণ্ড মতটি যে কি, সে সম্বন্ধে আমাদের মনে কোনরূপ ধারণা ছিল না। অথচ খুবই কৌতুহলের বিষয় যে সহস্র বর্ষ পূর্বে মুহ্যমান বাংলা ভাষার যে প্রথম নিদর্শনটি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে আমাদের কাছে উপস্থিত করে দিলেন- সেই চর্যাগীতির মধ্যেই আমরা বৌদ্ধধর্মের মূলকথা ‘করুণা মেহ নিরন্তর করিহা’ অথবা ‘বুদ্ধ নাটকে’র কথা প্রথম পেয়েছি। অন্যভাবে বলতে পারি- বাংলা ভাষার সূচনাই হয়েছে বুদ্ধ প্রসঙ্গ দিয়ে।
দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী বুদ্ধচর্চা মন্দীভূত থাকার পর উনিশ শতকে বাঙালির জীবনে নবজাগৃতির সঙ্গে বুদ্ধচর্চাও প্রাণবন্ত হয়। শুধু বঙ্গদেশেই নয়, এই শতাব্দীতে বিশ্ব জুড়েও বুদ্ধচর্চা যেন নতুন প্রাণ পায়। সিংহলে বৌদ্ধশাস্ত্র আবিস্কৃত হওয়ার পর টার্নার সাহেবের মহাবংশ, ফজবোল -এর ধম্মপদ -এর ল্যাটিন অনুবাদ, চাইল্ডার্স -এর দু’খণ্ড পালি অভিধান বিপ্লব ঘটিয়ে বসলো বুদ্ধচর্চায়। একে একে প্রকাশিত বিশপ বিগাডেট -এর The Life and Legend of Goutama, স্যামুয়েল বীল -এর রচিত Romantic Legends of Sakya Buddha, রীজ ডেভিস -এর Buddhism – A sketch of Life and Teaching of Goutama, কবি আর্নল্ড এডুইনের Light of Asia প্রভৃতি গ্রন্থ পশ্চিমী বুদ্ধচর্চার উজ্জ্বল নিদর্শন।

উনিশ শতকে বাংলায় বুদ্ধচর্চার পথিকৃৎ রাজেন্দ্রলাল মিত্র। সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ তাঁর ‘বুদ্ধদেব’ (১৯০৪) গ্রন্থে তাঁকে ‘উদ্ঘাটক’ -এর সম্মান দিয়েছেন। তাঁর A Introduction to the Lalitavistara বা The Sanskrit Buddhist Literature of Nepal (১৯৮২) রাজেন্দ্রলালের বৌদ্ধসংস্কৃতি চর্চার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর বাংলা ভাষার সম্ভবত (বৌদ্ধ রঞ্জিকার কথা মনে রেখে) সাধু অঘোরনাথ গুপ্ত।

তাঁর কথা বলার আগে সম্ভবত ‘মেঘা খমুজা’ (১২৫২ ব.) বইটির কথা বলে নেওয়া ভালো। এটিকেই ড. বেনীমাধব বড়ুয়া আধুনিক বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম বৌদ্ধগ্রন্থ বলেছেন, যদিও এটি অনুবাদের বই। এর পরিচায়িকা লিখেছেন আবদুল করিম সাহেব। এই প্রসঙ্গে তিনি ধর্মরাজ বড়ুয়া, অগগসার মহাস্থবির, রামচন্দ্র বড়ুয়া প্রমুখের বুদ্ধচর্চার ইতিহাস নিবেদন করেছেন। তবুও সাধু অঘোরনাথ গুপ্তের ‘শাক্যমুনি চরিত ও নির্বাণতত্ত্ব’ বইটির তুলনা হয় না। আসলে এসময়ে ব্রাহ্মসমাজ বিশেষ করে কেশবচন্দ্র সেনের প্রবর্তনায় বিশ্বধর্মগুলির স্বরূপ উদ্ধারের যে চেষ্টা চলেছিলো, অঘোরনাথের বইটি তারই ফসল। কেশবচন্দ্রের নির্দেশই অঘোরনাথ তিন ভাগে এই বই প্রকাশ করেন ‘তদনুগ বন্ধু’ ছদ্মনামে, পদে তাঁর মৃত্যুর পর (১৮৪১-৮১) উপাধ্যায় গৌরগোবিন্দ রায়ের সম্পাদনায় বইটি ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।

সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের আর এক কৃতী পুরুষ কৃষ্ণকুমার মিত্রের ‘বুদ্ধদেব চরিত ও বৌদ্ধধর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ” পরের বছরে আত্মপ্রকাশ করে। বইটি রচনায় কৃষ্ণকুমার Sacred Books of the East –কে আকর গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। উল্লেখ করার বিষয়, বই দুটি এদেশে কোন বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের (মহাবোধি সোসাইটি বা বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা) পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এর পর থেকেই বুদ্ধচর্চা বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই গৃহীত হতে আরম্ভ করে। নাটকের গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখেরা, কাব্যে নবীনচন্দ্র সেন প্রমুখেরা, উপন্যাসে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাখালদাস বন্দ্যেপাধ্যায়েরা, প্রবন্ধে কৃষ্ণবিহারী সেন, অক্ষয়কুমার দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মহেশচন্দ্র ঘোষ, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখেরা রীতিমতো অংশগ্রহণ করেন। সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ তো আছেন।

বাংলা ভাষায় বুদ্ধচর্চা বিষয়ে যাঁরা আলোচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে ড. বেনীমাধব বড়ুয়া, ড. সুধাংশু বিমল বড়ুয়া, ড. আশা দাস, ড. প্রজ্ঞানন্দশ্রী প্রমুখেরা উল্লেখযোগ্য। এখানো পর্যন্ত বাংলা ভাষায় বুদ্ধচর্চার প্রবণতা বর্তমান আছে। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে নাথ পাবলিশিং হাউস থেকে। ‘বৌদ্ধ জ্যোতিষ’ নামের এই বইটির লেখক অশোককুমার দত্ত। প্রকৃতপক্ষে বিষয়ে এটিই একমাত্র বই বলে আমার মনে হয়েছে।

শুধুমাত্র পুস্তক রচনা নয় বাংলা ভাষায় বুদ্ধবিষয়ক প্রবন্ধের সংখ্যা কয়েক সহস্র হতে পারে। এর মধ্যে এমন বহু প্রবন্ধ রয়েছে যাদের পুনরুদ্ধার এমনই প্রয়োজন। নইলে পত্রিকার জীর্ণ পৃষ্ঠা থেকে সেগুলি চিরতরে লুপ্ত হয়ে যাবে। তত্ত্ববোধিনী, ইতিহাস, উত্তরা, সাহিত্য, সাধনা, পরিচয়, প্রবাসী, ভারতবর্ষ, নারায়ণ, উদয়ন, সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, শনিবারের চিঠি, সমাজ, পঞ্চপুষ্প প্রভৃতি অ-বৌদ্ধ পত্রিকার সঙ্গে বুদ্ধচর্চায় অংশগ্রহণ করেছে জগজ্জ্যোতি (১৩১৫), তরুণ বৌদ্ধ (১৩২২-৩১), বৌদ্ধ বন্ধু (ঐ), নালন্দা (১৩৭৩) প্রভৃতি বুদ্ধবিষয়ক পত্রিকাগুলি। বর্তমানে পুরানো বুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থাবলীর কোন কোনোটি পুনর্মদ্রিত হয়েছে। এদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৌদ্ধধর্ম’, শরৎকুমার রায়ের ‘বুদ্ধের জীবন ও বাণী’, অঘোরনাথ গুপ্তের ‘শাক্যমুনি চরিত ও নির্বাণতত্ত্ব’ প্রভৃতি গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য। পত্র-পত্রিকা থেকে উদ্ধার করে মূল্যবান প্রবন্ধাদির একটি বিস্তৃতখণ্ড প্রকাশের প্রস্তাবও এই প্রসঙ্গে নিবেদন করি।

মোটামুটি হাজার পঁযত্রিশেক বাংলা ভাষাভাষী বৌদ্ধ পশ্চিমবঙ্গে বাস করেন। এছাড়া বাংলাদেশেও বেশ কিছুসংখ্যক বৌদ্ধ রয়েছে (ভিক্ষু কৃপাশরণ চট্টগ্রাম থেকেই এসেছেন)। স্যার আশুতোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৌদ্ধশাস্ত্র পাঠক্রম চালু করেছিলেন। একটি প্রস্তাব রাজা সরকারের কাছে পেশ করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে যাতে বুদ্ধচর্চা পশ্চিমবঙ্গে গৃহীত হয়, তার অবস্থা করা প্রয়োজন। এতেও বাংলা ভাষায় বুদ্ধচর্চা অব্যাহত থাকবে। এ বিষয়ে বৌদ্ধ গ্রন্থাগারগুলিরও ভূমিকা আছে। বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার গুণালঙ্কার গ্রন্থাগারটি সহ মহাবোধি সোসাইটির গ্রন্থাগারটিকেও সাধারণ পাঠকের কাছে উন্মুক্ত করতে হবে। অন্যান্য সাধারণ গ্রন্থাগারগুলির ‘বুদ্ধ সম্পদ -এর পৃথক তালিকা নির্মাণ করে সেগুলি প্রকাশ করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষা দপ্তর এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরকেও তৎপর হতে হবে। শুধু ধর্মাচরণ নয়, ধর্মের সারবস্তুকে সর্বজনীন করে তোলার মধ্যেই বুদ্ধচর্চার মূল লক্ষটুকু নিহিত থাকলে বাংলা ভাষায় বুদ্ধচর্চার ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে।

সৌজন্যে : Hundred years of the Buddha Dharmankur Subha, the Bengal Buddhist Association Calcatta, 1992

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *