
লিখেছেনঃ রাজীব বড়ুয়া
ছোটবেলায় একটা রূপক গল্প পড়েছিলাম। শিরোনামটি ঠিক মনে আসছে না। সারগর্ভটা তুলে ধরছি। গ্রামের একজন যুবক ছিল খুবই শান্ত প্রকৃতির। কোলাহল, উৎসব আমেজ তার কিছুতেই ভাল লাগতো না। সে চাইতো একাকী থাকতে। সাংসারিক নানা ঝামেলার মধ্যেও সে থাকতে চাইতো দায়িত্বহীন, চিন্তাহীন এক নির্ঝঞ্জাট সত্তা হিসেবে। তাই সে ভাবলো লোকালয় ছেড়ে তাকে অরণ্যেই যেতে হবে।
যথা চিন্তা, তথা কাজ। ব্যস! বলা নেই, কয়া নেই এক্কেবারে হঠাৎ রওনা। অবশেষে পৌছালো প্রকৃতির গর্ভে; অরণ্যে। রাতের বেলা বরাবরের মতো সে ঘুমাতে গেলো, কিন্তু কিছুতেই সে ঘুমাতে পারছিলো না। কারণ খুঁজতে গিয়ে সে উদ্ধার করলো ইঁদুরের উৎপাত। কোনভাবেই সে ইঁদুরের উৎপাত কমাতে পারলো না। পরদিন গেলো লোকালয়ে বিড়াল আনতে। বিড়াল সাথে থাকলে হয়তো ইঁদুরের উৎপাত কমে যাবে। যাক, শেষমেশ বিড়াল নিয়ে আসলো। ইঁদুরেরা সব ভয়ে পালালো। কিন্তু আবার বিপত্তি! এবার বিড়ালটা খাবে কি? তার জন্যে তো দুধ লাগবে। তাই যুবক বিড়ালের জন্যে দুধের ব্যবস্থা করতে গেলো আবার লোকালয়ে। এইবার সাথে নিয়ে এলো গাই গরু। গাই গরু লালন পালন করতে তার অনেকটা সময় লেগে যায়। পরিশেষে দেখা গেলো গাই গরু গোবর বিষ্টা থেকে মশা মাছির উপদ্রব বেড়ে গেলো। নাহ! এবার বোধহয় বেচারা যুবকের আর শান্তিতে থাকা হবে না। যুবক যতোই চেষ্টা করলো শান্তিতে নির্জনে বাস করবে, ততোই বিপত্তি দেখা দিল। একটা সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য আরেকটা সমস্যার উদয় হচ্ছে।
গল্পটা রূপক, কাল্পনিক যাই হোক না কেন শিক্ষনীয় একটা বিষয় আছে। সেটা হল, সমস্যা সৃষ্টি হয় এমন কাজ না করে নিজের স্বীয় ব্রতে মনযোগী হওয়া। সমস্যার পেছনে ছুটতে গেলে সমস্যার উপর সমস্যা বাড়তেই থাকবে। সমাধানের পথ খুঁজতে খুঁজতে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব হবে না।
গল্পটার অবতারণা যে কারণে তা বলছি এবার। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে ধর্মের প্রচার প্রচারণা মিশে গেছে বৈজ্ঞানিক গ্যাজেটের মাঝে। ধর্মকে পূঁজি করে কেউ নিজেদের নাম কামাই করছে, কেউ আছেন নিজের পকেট ভারী করতে ব্যস্ত। অরণ্যে থাকা ভিক্ষুরাও পিছিয়ে নেই এসবের দৌরাত্নে। ভাববেন না, আমি ভিক্ষু বিদ্বেষী। আমি ভিক্ষুদের প্রতি যত্নশীল এবং শ্রদ্ধাশীল। সেটা হয়তো অন্য আর দশজনের মতো নয়। কারণ আমি নাম দেয়া, ফটোসেশন করা কিংবা প্রচার করার মতো মানসিক শক্তিসম্পন্ন নই। আমি অনেকটা প্রচার বিমুখ এক্ষেত্রে। বড্ড অলস প্রকৃতির বলা যেতে পারে।
সম্প্রতি, আমাদের বৌদ্ধ সমাজে বেশ কয়েকজন আরণ্যিক ভিক্ষু বেশ সমাদৃত হয়েছেন। আলোচনার তুঙ্গে বলুন কিংবা জনপ্রিয়তার খ্যাতিরে তারাই এখন সর্বেসর্বা। আমার আজকের বিষয়বস্তু আরণ্যিক ভিক্ষুদের কর্মকান্ড নিয়ে। একজন ভিক্ষু লোকালয়ে বিহার না করে বৃক্ষমুল, অরণ্য কিংবা শ্মশান কেন যায়? তারা ধুতাঙ্গবিধি কঠোরভাবে পালন করার জন্যেই তো সেখানে যায়। তেরো প্রকার ধুতাঙ্গগুলো হলঃ পাংশুকলিক (ময়লা বস্ত্র পরিধান), পাত্রপিন্ডিক (ভিক্ষাচরণ করে আহার গ্রহণ), সপাদানচারিক (সাপের ন্যায় প্রতিটা ঘরে ঘরে ভিক্ষাচরণ করা), একাসনিক (এক আসনে বসে আহার গ্রহণ), পাত্রপিন্ডিক (একটি মাত্র পাত্রে আহার গ্রহণ), খল্লুপচ্ছভিত্তিক (খল্লুপ পাখির ন্যায় উচ্ছৃষ্ট বর্জন করে আহার শুরু করা), আরণ্যিক (অরণ্যে বাস), বৃক্ষমুলিক (গাছের নিচে বাস), অবভোকাশিক (খোলা আকাশের নীচে বাস), শ্মশানিক (শ্মশানে বাস), যথাসন্তুষ্টিক (সন্তুষ্টিপরায়ণ হয়ে অবস্থান করা) ও নৈসজ্জিক (রাতের বেলা না ঘুমিয়ে দুই যাম বসে ধ্যান, এক যাম হেঁটে হেঁটে ধ্যান করা)।
সংক্ষেপে এগুলোই হল তেরো প্রকার ধুতাঙ্গ। এরপর আসছে চারিস্মৃতিপস্থান ভাবনা যাকে পালিতে বলা হয় সতিপটঠান। চার প্রকার স্মৃতিপ্রস্থান হল চিত্তজ বিষয়ে ধ্যান, অনুভূতি বিষয়ে ধ্যান, কায়ের অনুদর্শনে ধ্যান এবং ধর্মত বিষয় (চারিসত্য/অষ্টাঙ্গিক মার্গ) নিয়ে ধ্যান। এসবের গভীরে আর না যাই। লিখতে গেলে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতে হবে। মূল আলোচনায় আসি।
ধুতাঙ্গ পালন হতে শুরু করে চারিস্মৃতিপ্রস্থান ভাবনা পর্যন্ত হিসেব করতে গেলে যে কাউকে অবশ্যই একাকী নির্জনে বাস করতে হবে। এটা বুদ্ধের উপদেশ। বুদ্ধের প্রশংসীত একমাত্র পথ।
কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের জনপ্রিয় ধুতাঙ্গ ভান্তেদের বর্তমান অবস্থাগুলো বিবেচনা করে দেখুন। অরণ্যে উনারা একাকী নির্জনে ধ্যান করতে যান। তারপর দেখা যায়, লম্বা সাড়ি করে শিষ্য প্রশিষ্য বেষ্টিত হয়ে পিন্ডচারণে বের হোন। এতো শিষ্য প্রশিষ্যদের পরিচালনা করাও তো একটা বিশাল ব্যাপার। যথেষ্ট মাথা ঘামাতে হয়। তাদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল, বিবাদ থাকবেই। তারা কেউই মুক্ত পুরুষ নন। তবে কেন একজন অরণ্যচারী একাকী থাকার বদলে দলবল নিয়ে বিহার করেন ? উনার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি শিষ্য সংখ্যা বাড়ানো না ধ্যান প্রশিক্ষক হওয়া ? এটা কি বুদ্ধের শিক্ষার বিপরীত নয় কি ?
দ্বিতীয়ত, যথাসন্তুষ্টিক ধুতাঙ্গের শর্ত আর থাকছে কই! এতো শিষ্য প্রশিষ্যদের থাকার ব্যবস্থা করতে এটা লাগবে, ঐটা লাগবে। দশটা কুঠির লাগবে, একটা দ্বিতল ভবন হলে ভালো হয়। যা আছে তাতে সন্তুষ্টি পরায়ণ না হয়ে উলটো চাওয়া পাওয়ার প্রকাশ করলে যথাসন্তুষ্টিক ধুতাঙ্গ ভঙ্গ হয়।
৭৫ সেখিয়ার কথা নাই বা বললাম। পিন্ডচারণের সময় কথা বলা, হাত নেড়ে চলাফেরা, দৃষ্টি চার হাতের অধিক যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো সেখিয়ার লংঘণ যা অনেক ধুতাঙ্গধারী ভিক্ষুদের মাঝে সাদৃশ্যমান।
বর্তমানে আলোচিত সুপরিচিত প্রতিটা আরণ্যিক ধুতাঙ্গ ভিক্ষুদের কুটিরগুলোতে নজর দিন। জীর্ণশির্ণ কুঠির গুলো পরিণত হয়েছে সুরম্য প্রাসাদে। কারুশিল্পের ছোয়া যেন এসব কুঠিরকে বানিয়েছে স্বর্গের প্রতিবিম্বে। আমার কাছে এসব ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই না। বিহারে থাকলে ফাংয়ের পয়সা দিয়ে কতো-ই বা পাওয়া যায়, দায়কও জুটে না ভারী পকেটের। শ্মশান অরণ্যে থাকলে ভারী পকেটের দায়ক জুটে, লাভ সৎকারের অভাব হয় না। এটাই ট্রেন্ড বর্তমানের। আমার কথাগুলো তেতো মনে হতেই পারে। আপনি যদি এসব ভিক্ষুদের অন্ধ বিশ্বাসী হয়ে থাকেন তো আপনার অবশ্যই খারাপ লাগবে। মস্তিষ্ক হতে যুক্তি আসবে না, গালি গালাজ-অশ্রাব্য বাক্য ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবেন না।
আমার কাছে আরণ্যিক ভিক্ষু মানে, যিনি অরণ্যে একাকী বিহার করেন। নির্জনে ধ্যানানুশীলন করে, ধুতাঙ্গব্রত পালন করে। করণীয় মৈত্রী সূত্রে বুদ্ধ প্রশংসা করে আরণ্যিক ভিক্ষুদের বলেছেন,
১. লৌকিক প্রজ্ঞা দ্বারা নির্বাণ শান্তপদ বলে জেনে তা লাভেচ্ছুক ব্যক্তি দক্ষ (সক্ষম), সরল (ঋজু) অকুটিল, সুবাক্য ভাষণকারী মৃদু স্বভাব ও অভিমানহীন হবে।
২. তিনি যথালাভে সন্তুষ্ট, সুখপোষ্য, অল্পকৃত্য (বহুকাজে অলিপ্ত) অল্পে তুষ্ট, শান্তেন্দ্রিয়, প্রজ্ঞাবান, গম্ভীর (চাঞ্চল্যহীন) ও গৃহস্থদের প্রতি অনাসক্ত।
৩. এমন কোনো ক্ষুদ্র পাপ (হীন আচরণ) করবে না, যা দেখে অপর বিজ্ঞগণ (অপর পন্ডিত ও ধর্মাবলম্বী) নিন্দা করতে পারে আর সকল প্রাণীর সুখ ও নির্ভয় (ভয় শূন্য) কামনা করবে।
উপসংহারে, বলতে চাই- শ্রদ্ধেয় ভিক্ষুগণ অরণ্যে নির্জনে বিহার করুন। অশৈক্ষ্য হতে না পারেন অন্তত চারি পুদ্গগলের একজন হতে চেষ্ঠা করুন। তাও না পারলে বুদ্ধ প্রশংসীত আদর্শ ভিক্ষু হোন। আমাদের শ্রদ্ধা একজন আদর্শের ভিক্ষুর প্রতিও সমান বলবৎ। অরণ্যে ছেঁড়া বস্ত্র পরিধান করলেই যে মার্গলাভী হবেন তা নয় ; গৃহী অবস্থায় থেকেও উ কোবিদ ভান্তে মার্গ লাভ করেছিলেন। তাই আয়োজনে ব্যতিব্যস্ত না হয়ে আচরণে মনযোগী হোন। তাতে আত্নহীত-পরহীত দুটোই হবে। আগে নিজেদের মুক্ত করুন, তারপর ধ্যান শিক্ষা দিন। শিষ্য-প্রশিষ্য সংখ্যা এমনিতেই বেড়ে যাবে। দ্বিতল, বহুতল সব হবে। তাতে অবশ্যই প্রকৃত মার্গলাভীদের চিত্ত রমিত হয় না। প্রকৃত মার্গলাভীচ্ছু আর প্রকৃত মার্গলাভী প্রকৃতিকেই কুঠির হিসেবে ধারণ করে। প্রকৃতিতে-ই ধর্মগুলো দর্শন করে। আত্নদর্শন ভাঙ্গা জীর্ণশির্ণ কুঠিরেও হয়। রূপক গল্পের যুবকের মতো এক একটা ঝামেলা সাথে যুদ্ধে যাবেন না। অরণ্যে কিন্তু বন্যরাও থাকে লুকিয়ে। পরে অরণ্য ছেড়ে পালাতে হবে কিন্তু। একজন পালালো বন্যের ভয়ে, অনেকে পালিয়েছে নীরবে ; আরো পালাবে। ধ্যান, মার্গ কিছুই হবে না। শেষমেষ কুঠিরও যাবে। তাই সাধু সাবধান হোন। মার ভুবনের মার্গ পরিবর্তন করুন, সম্যক মার্গে চলুন অমার ভুবনে নিশ্চয় পৌছাবেন।
সকলের জয় মঙ্গল হোক।
প্রজ্ঞার আলো প্রস্ফুটিত হোক সকল অন্তরে।