একটি ভাবনা ; পরিত্রান ও রক্ষার উপায়

রাজীব বড়ুয়া
আপনারা একটি জিনিস লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয় যে ফ্রান্সে এই পর্যন্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের যতজন মারা গিয়েছে তাদের বেশিরভাগই যুবক। তার মানে আমি কিংবা আপনি বৃদ্ধ হওয়ার আগেই যেকোন সময় যেকোন মূহুর্তে মারা যেতে পারি। সেটা রোগে আক্রান্ত হয়ে হোক কিংবা অনাকাঙ্খিত দূর্ঘটনায় হোক। এমতাবস্থায় একটি পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। প্রথমত স্বজন হারানোর বেদনা, দ্বিতীয়ত আর্থিক দূরবস্থা। আমরা বিদেশ বিভূঁইয়ে যতোই রঙ-তামাশায় মাতি না কেনো একটা অনাকাঙ্খিত মৃত্যু আমাদের সবাইকে একটি বারের জন্যে হলেও নিজেদের বিবেকটা নাড়া দেয়। আর সেই ভাবনা থেকে কলম তুলে নিতে বাধ্য হয়েছি দুটি কথা উপস্থাপন করবো বলে। আমার লেখনীর স্বার্থ একটাই; সেটা হলো নিজেদের মধ্যে একতা আর সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
মানবাধিকার রাষ্ট্র ফ্রান্সে বসবাস আমাদের। এটা বীমা প্রকল্পের পটভূমি। এখানে সবকিছুতে আপনি চাইলে বীমা সংযুক্তি করতে পারেন। বিভিন্ন প্রকারের বীমা রয়েছে। আমি প্রয়োজনীয় কয়েকটি বীমার কথা বলতে চাই। সেই সাথে একটি অকাল মৃত্যুর পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানাতে চাই।
ব্যাংকে আমাদের সকলের একটি Assurance de décès করে রাখা উচিত যার Capital কমপক্ষে ১৫ থেকে ২৫ হাজার ইউরো থাকে। এটা মৃত্যুর পর মৃতের পরিবারকে অর্থ সাহায্য হিসেবে প্রদান করা হয়। এককালীন এই অর্থ প্রদান করা হয় না। এটা প্রথম ধাপে ৫০০০ ইউরো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্যে, পরবর্তী ধাপে ৫/১০ হাজার ইউরো অসহায় পরিবারকে আর্থিক দূরবস্থার কথা চিন্তা করে দেয়া হয়। সর্বশেষ ধাপে মৃত ব্যক্তির বাচ্চার শিক্ষাক্ষেত্রে প্রদান করা হয়। এটা Protection Famille হিসেবে সুরক্ষা বীমাও বলা যায়। এটা সবারই করা উচিত যারা এখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। অন্তত নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করে এটা করা অত্যাবশ্যক।
আরেকটি বীমা আছে যেটা হল Assurance d’obsèques। এটা মৃত্যুর ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই বীমা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়। এই বীমা একজন মৃতের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সংক্রান্ত সমস্ত খরচ বহণ করবে। এটা ৩৫০০ থেকে ৫০০০ ইউরো পর্যন্ত কভারেজ করে। মাসিক ১০ থেকে ৩০ ইউরো পর্যন্ত আসতে পারে। মৃতের গোসল, কফিন খরচা, পোষাক, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের হল ভাড়া এবং দাহকার্য পর্যন্ত সমস্ত খরচ তারাই বহণ করবে। তবে এক্ষেত্রে আলোচ্য বিষয় হলো ইন্সুরেন্স করার সময় অবশ্যই তাদের Condition générale সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়েই inscription করবেন।
বলাবাহুল্য, এসব ইন্সুরেন্সের বিপরীতে যদি আপনারা ব্যাংক থেকে কোন প্রকার ঋণ (Crédit) নিয়ে থাকেন তাহলে সবচেয়ে বড় বোকামী হবে। কেননা ঋণগ্রহণকারী যদি কোন কারণে ঋণের টাকা পরিশোধ না করে মারা যান সেক্ষেত্রে ব্যাংক অবশ্যই উক্ত Assurance কোম্পানীগুলোতে প্রাপ্ত অর্থ থেকে আপনার বকেয়া ঋণ বাবদ অর্থ কর্তন করবে। মনে রাখবেন, আপনি যখনই বড় অংকের ঋণ নিবেন অবশ্যই একটি আলাদা বীমা করবেন Assurance de Crédit। এটা আপনার মৃত্যুর পরবর্তীতে আপনার বকেয়া ঋণগুলো পরিশোধ করবে।
মৃত্যু পরবর্তী কাজের আরেকটি বিশেষ ধাপ হলো মৃতব্যক্তির কাজের স্থানে গিয়ে মালিকপক্ষকে জানানো। মালিকপক্ষ থেকে Participation d’obsèques অর্থাৎ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচের একটি অংশ আদায় করা যায়। এছাড়াও বাচ্চার জন্যে একটি অর্থ সাহায্য পাওয়া যায় সাবালক না হওয়া পর্যন্ত।
এই বিষয়গুলো চিন্তা রেখে আজ থেকে সচেতন হোন। আপনি কি চান না আপনার মৃত্যুর পর আপনার পরিবারটি মাথা তুলে দাঁড়াক। আপনি তাদের জন্যে হয়তো অর্থবিত্ত কিংবা ঘর দালান রেখে যেতে না পারেন অন্তত একটি বীমা তো করতে পারেন তাদের সুরক্ষার জন্যে। এটি এখন সময়ের দাবি। আপনি যদি ঘর সংক্রান্ত অর্থঋণ রেখে মারা যান তাহলে সেটা হিসাব ভিন্ন। সেটা নির্ভর করছে আপনার ইন্সুরেন্সের কভারেজের উপর। যদি 100% sur chaque tête হয় তাহলে দুইজনের একজন মারা গেলে বীমা কোম্পানী সম্পূর্ণ ঋণ প্রদান করবে। জীবিত উত্তোরাধিকারী সেটার মালিকানা পেয়ে যাবে বীমার চুক্তিনুযায়ী। আর যদি quotité partagée হয়ে থাকে তাহলে মূল ঋণের অর্ধেক পরিশোধ করবে বীমা কোম্পানী বাকিটা জীবিত উত্তরাধিকারী।
আবার যাদের গাড়ীর বীমা আছে সেখানে খেয়াল করবেন একটি অপসন রয়েছে Protection Conducteur। এটাতে আপনি দূর্ঘটনাজনিত সমস্ত চিকিৎসা খরচ কভারেজ পাবেন। আপনার মৃত্যু হলে সেখানে আপনার পরিবার বিশাল অংকের অর্থ সুরক্ষা পাবে। সেটা হতে পারে ৫ লক্ষ ইউরোর সমপরিমাণ। সেটা নির্ভর করছে আপনার ইন্সুরেন্সের ধরণের উপর।
সে যাই হোক, এতোগুলো প্রাণ অকালে চলে গেলো আমাদের চোখের সামনে আমরা কিছুই শিখতে পারলাম না। একজন মরলে আমাদের শুরু হয়ে যায় অর্থ কালেকশান। ৫ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা করে অর্থ সংগ্রহ। কেনো রে ভাই! এটা না করলে হয় না?
সবাই মিলে অন্তত ৫ টাকা করে দিন প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট ফান্ডে। অথবা এককালীন অর্থ দান করুন একটি ফান্ডে। এই ফান্ড একটি সোসাইটির নাম দিয়ে ব্যাংকে রাখা হোক। এরকম একটা দূর্দশা আসলে আমরা পরিবারটিকে অর্থ সহায়তা দিতে পারি। এটা শুধুমাত্র সামাজিক দায়বদ্ধতা নয় বরঞ্চ জ্ঞাতিসেবা। আমাদের যেহেতু ভিন্ন মতাদর্শ, যেখানে একটার উপর ৮/৯ টা বিহার সেখানে ৫/৬ টা ফান্ড করা কোন বিষয়ই না।
গভীরভাবে চিন্তা করুন। একটি বিহার হতে না হতে আরেকটি বিহার আমরা করতে সক্ষম হচ্ছি। নূন্যতম এক মিটার জায়গা দান করানোর জন্যে আমাদের ভিক্ষুরা আমাদের মধ্যে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিলো যার ফলে আমরা অসাধ্যকে সাধন করতে পেরেছি। সেখানে যদি ভিক্ষুরা এগিয়ে আসেন এই কাজটা করাটা তাদের জন্যে অসাধ্য কিছুই নয় বৈকি! সমাজে দু-একজন থাকবেই মতভিন্নতা দেখাবে। আমি আপনি এগিয়ে আসলেই সবাই এগিয়ে আসবে।
আরেকটি প্রস্তাব রাখতে চাই আপনাদের নিকট। আমরা কি পারি না একটি Crémation সেন্টার (ইলেক্ট্রিক চুল্লী) নিজেদের করে প্রতিষ্ঠা করতে! বিহার তো অনেক হলো এবার না হয় শেষ গন্তব্যের জন্যে একটি সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা করি। এটার জন্যে নেতাগিরী বাবুগীরি না করে সবাই এক হয়ে একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাই। এই প্রতিষ্ঠানে ঠাঁই হবে ভিক্ষু, গৃহী আবাল বৃদ্ধ বনিতাদের। ইউরোপের বুকে চিহ্ন এঁকে দিই আমরা বড়ুয়া জনগোষ্ঠীরা করতে পেরেছি একটা ঠিকানা নিজেদের শেষযাত্রার।
কলেবর বৃদ্ধি না করে পরিশেষে বলতে চাই, অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াবেন। একটি কাজ দিয়ে হোক, একটি এডমিনিস্ট্রেটিভ রঁন্দে-ভ্যুতে সহযোগীতা করে, অর্থ সহায়তা দিয়ে, সুন্দর ব্যবহার দিয়ে পাশে দাঁড়ান। খোঁজ খবর রাখুন। একটা সময় দেখবেন পরিবারটি দাঁড়িয়ে গেছে। আবার হাসবে নতুন করে কোন এক জীবন সংগ্রামে।
সদ্য প্রয়াত রাতুল বড়ুয়ার (মামা) পারলৌকিক সুখ ও শান্তি কামনা করি।
অকাল প্রয়াতের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি।
সকলেই মরিতেছে, আমিও মরিবো।
এটাই জাগতিক সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *